বরিশাল: জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা কোনো দল, গোষ্ঠী আর পরিবারতান্ত্রিক বিজয় আর শাসন আমরা দেখতে চাই না, দেশবাসী মুখিয়ে আছে নতুন বাংলাদেশ, নতুন ব্যবস্থাপনা দেখার জন্য। নতুন বাংলাদেশ হবে জনকল্যাণমূলক বাংলাদেশ, যা কোনো দল ও ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য হবে না।তিনি বলেন, যারা নিজের দল সামলাতে পারে না, তারা তো দেশও সামলাতে পারবে না। যারা নিজের দল সামলাতে পারে, তারাই দেশ সামলাতে পারবে।
আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চেষ্টা করেছে নিজের দল সামলাতে।শুক্রবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা সদরের আরসি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।এসময় জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, আমরা নতুন করে কোনো চোর, লুটেরা জন্ম দেবো না। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো ফোকলা হয়ে দরদর করে কাঁপছে।অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে, আগামীর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ হবে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা মনে করি এটা কঠিন হলেও অর্জনযোগ্য, সব জায়গাতে দক্ষ মানুষেরা যখন আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাবেন, বাকিরা তখন বার্তা পেয়ে যাবেন। অনেকেই নিজে নিজে তওবা করে সোজা হয়ে যাবে। যারা সংশোধনের সুযোগ নেবেন না, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, আমাদের টাকা আছে কিন্তু তা দেশ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। যারা নিজেরা লুণ্ঠন ও পাচারের সঙ্গে জড়িত তারা জীবনেও ওই টাকা ফেরত আনতে চাইবে না। বরং তারা আবার বাংলাদেশ লুটেপুটে খেতে চাইবে। আমরা কথা দিচ্ছি, যদি সুযোগ পাই তাহলে ওদের মুখ দিয়ে, পেটের ভেতর হাত দিয়ে সব বের করে আনা হবে এবং ওদের (লুটেরাদের)ও আনা হবে। কারণ ওরা রাষ্ট্রের দুশমন, জনগণের টাকা চুরি করেছে, এটা তাদের বাবার টাকা হলে চুরি করে দেশ থেকে পালানোর দরকার হয় না।
তিনি বলেন, সরকারি দলের জন্য এক বিচার আর বিরোধী দলের জন্য এক বিচার, দলের জন্য এক ধরনের বিচার আর নিরীহ মানুষের জন্য এক ধরনের বিচার-এরকম বিচারের অস্তিত্ব আমরা রাখবো না। যে অপরাধে একজন সাধারণ মানুষের বিচার ও শাস্তি হবে, একই অপরাধ যদি রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী করলেও তাদের ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না, বিচারের আওতায় আনা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা দুর্নীতির পাতা আর ডাল ধরে টান দেবো না, আমরা দুর্নীতির ঘাড় ধরে টান দেবো। রাঘব বোয়াল, গডফাদার, মাফিয়ারা থাকবে আইনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে আর ছিঁচকে চোরদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেবেন-এটা হবে না। কারণ এটা চরম অন্যায়। আমরা অঙ্গীকার করেছি, যদি আল্লাহ আমাদের দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, তাহলে আমরা নিজেরা চাঁদাবাজি করবো না, কাউকে করতেও দেবো না, সেই সঙ্গে যারা দুর্নীতি করেন তাদের আর সেটা করতে দেওয়া হবে না। দুর্নীতি বন্ধ হয়ে গেলে আপনার-আমার জীবনে অর্ধেক শান্তি নেমে আসবে।
তিনি বলেন, আমরা হারামের ওপর হাত রাখবো না। চাঁদাবাজি হারাম হওয়ায় আমাদের একটা লোকও চাঁদাবাজি করেনি, আমাদের একটা লোকও কোনো স্ট্যান্ড দখল করেনি, মামলা বাণিজ্য করেনি। মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ইজ্জতের পাহারাদার হিসেবে ৬ আগস্ট থেকে টানা ১৫ দিন সারা বাংলাদেশে আমাদের কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছে। যাতে কোনো দুষ্ট লোক দেশের পরিস্থিতি খারাপ না করতে পারে সে জন্য। আমরা এদিকে পড়ে থাকলেও আরেক দল লেগে গেল নিজেদের কিসমত বানাতে। কিন্তু এর নাম তো রাজনীতি না, এটা হলো দুর্বৃত্তপনা। রাজনীতি হবে নীতির রাজা, মানুষের কল্যাণ সাধন করা। মানুষের কোনো অকল্যাণ রাজনীতির অংশ হতে পারে না।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টে পরিবর্তনের পর সবার আগে ঘোষণা করেছি দলের পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে আমরা প্রতিশোধ নেবো না। আমাদের সহকর্মীদের বললাম-যদি শহীদ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর ন্যায্য বিচার চাওয়ার ও পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আপনারা যদি বিচারপ্রার্থী হন তাহলে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো। কিন্তু সাবধান, মামলা রুজু করতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কারও নাম দেওয়া যাবে না। সারা দেশে আমরা হাজার হাজার মামলা করিনি, আমাদের ৮টা মামলা রয়েছে যেগুলোতে আসামি মাত্র ১ জন। আপনারা দ্বিতীয় খুঁজে পাইনি, তাহলে তাদের নাম দেবো কেন? কিন্তু এখানে আশ্চর্য হলাম-কেউ কেউ মামলা করেছেন ৮ শত–৯ শত আসামি, তারপর আবার অজ্ঞাত আসামি। আবার এই মামলা করে অনেকে বাণিজ্য করছে। নিরীহ যারা কোনো অপরাধে ছিল না, হয়তো কোনো দল সমর্থন করেছে তাই তার নাম দিয়ে এখন খাজনা-পাটি আদায় করা হচ্ছে। মনে রাখবেন, দিন শেষে ওই মানুষগুলোর কাছে আপনাকে-আমাকে যেতে হবে। যদি আপনি রাজনীতি করেন তাহলে জনগণকে উপেক্ষা করে চলতে পারবেন না।
এসময় জামায়াতে আমির আরও বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একে একে ১১ নেতাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে, জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে। ফাঁসির আদেশের পর একজন যে বেঁচে ছিলেন, ৫ আগস্টের পরে নিরপেক্ষ সরকারের সময় তাকে আদালত শুধু মুক্তই ঘোষণা করেন। আর আদালত বলেছেন, বেঁচে যাওয়া জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে যে সাক্ষ্য আনা হয়েছিল একটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়, আর যে অভিযোগ আনা হয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ তার প্রমাণ দিতে পারেনি। তাহলে বুঝুন, যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে তাদের কীভাবে দেওয়া হয়েছে।তিনি বলেন, অনেক কষ্টে জামায়াতে ইসলাম চললেও কখনও জনগণের দুঃখে চুপ করে থাকেনি। সবসময় মানুষের পাশে ছিল, সেটা সীমিত সামর্থ্য দিয়ে হলেও। কারণ আমরা হৃদয় দিয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করি।
তিনি বলেন, লুটপাট সব যুগেই ছিল, কিন্তু সাড়ে ১৫ বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য খুবই খারাপ সময়। ওই সময় ব্যাংক, বিমা, শেয়ার মার্কেট লুট হয়েছে এবং মেগা প্রকল্পের নামে জনগণের টাকা লুট হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈধ হিসাব অনুসারে, সাড়ে ১৫ বছরে সরকারি দলের লোকেরা পাচার করেছে ২৮ লাখ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাজেটের চারটি বাজেটের সমান। আর যা বাজার করতে পারেনি তা মাটির নিচে কলসিতে রাখা হয়েছে, এরকম যে কত আছে তা আল্লাহই ভালো জানে।
তিনি বলেন, আমরা ধারণা করি, শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব তার সমস্ত যোগ্যতা, আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করেছেন কিন্তু তিনি একা তো দেশ চালাতে পারবেন না। তার প্রয়োজন ছিল তার সহযোগীদের সহযোগিতা। সেই সহযোগিতা তিনি পাননি, ফলে আক্ষেপ করে অনেক কথাই তিনি বলে গেছেন সেগুলো আমি বলতে চাই না। এরপর তিনবার সংক্ষিপ্ত ক্ষমতার হাতবদল হয়ে জিয়াউর রহমান সাহেব আসলেন। তিনি দেশ চালালেন, কিন্তু তাকে নির্মমভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হলো, যেভাবে শেখ মুজিব সাহেব নিলেন সপরিবারে। ব্যতিক্রম শুধু এতটুকু, তার (জিয়াউর রহমান) পরিবারের কোনো ক্ষতি সাধন না করে তাকে (জিয়াউর রহমান) খুন করা হলো। তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন, আবার বাংলাদেশ অস্থির হয়ে গেল, ছাত্তার সাহেব আসলেও সামাল দিতে পারেননি।

